করোনা কালে লকডাউনের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক:নিজস্ব প্রতিবেদক:
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:৩১ পূর্বাহ্ণ, ২৯ এপ্রিল ২০২০




একটানা এতো দীর্ঘ অবসর তপনের জীবনে এই প্রথম। এক চিলতে ঘরের মধ্যে সারাদিন শুয়ে বসে থেকে আর সময় কাটতে চায় না। তপনের স্ত্রী সকালে ঘুম থেকে উঠেই সংসারের টুকিটাকি কাজ শুরু করে। এরপর রান্নাবান্না সেরে সারাদিন মোবাইল ফোনে ফেসবুক দেখে সময় কাটায়। তপন প্রথম কয়েকদিন খুব ফেসবুক চালিয়েছে। এখন বিরক্ত লাগে। ফেসবুক খুললেই শুধু করোনার খবর, ব্যর্থতার খবর আর চাউল চুরির খবর ভেসে আসে। সারাদেশে দায়িত্ব প্রাপ্ত ত্রাণ বন্টনকারীদের মাঝে চাউল চুরির যেন হিড়িক লেগেছে!

তপন টিভিতে খবর দেখছিল। দেশের করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। টিভি দেখা বাদ দিয়ে তপন ঘরের মধ্যে একটু পায়চারি করে জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালো। তপনের ছোট্ট ছেলেটাও গিয়ে দাড়ালো বাবার পাশে। ওর নাম নিসু। এবার সে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছে। তপনের বাসাটা চার তলায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে গাছপালার উপরিভাগ দেখা যায়। তপন দূরের গাছ গাছালির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। নিসু বাবার পাশে দাড়িয়ে জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকাচ্ছে আবার বাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

আব্বু কি দেখছো বাইরে? ছেলের কথায় তপনের আনমনা ভাবটা কেটে গেল। নিসুর দিকে ফিরে বলল, তেমন কিছু না বাবু। দূরের গাছগুলো দেখছি, কেমন করে তারা দাড়িয়ে আছে। বাবার কথা শেষ হতেই নিসু বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, বাবা আমার খুব ইচ্ছা হয় একটা বড় গাছের মাথায় উঠতে! ছেলের কথায় তপন বেশ উৎকন্ঠায় পড়ে গেল, ছেলেকে নিজের শরীরের সাথে জড়িয়ে ধরে বউকে ডেকে বলল, তোমার ছেলের কথা শুনেছো ঝুমুর?

তপনের কথা শুনে পাশের রুম থেকে নিসুর মা ঝুমুর বেরিয়ে এলো। কি বলছে নিসু?

বাবা মা হঠাৎ তার কথা নিয়ে সিরিয়াস হয়ে যাওয়ায় নিসু কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে তপন বলল, তোমার ছেলের নাকি ইচ্ছা জাগে একটা বড় গাছের মাথায় উঠতে!
তপনের কথা শুনে ঝুমুর কিছুটা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে নিসুকে বলল, সে কিরে নিসু! তোর হঠাৎ এরকম ইচ্ছা হলো কেন? নিসু কোনও কথা বলছে না। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে তার ইচ্ছাটর কথা বলে খুব ভুল করে ফেলেছে। ঝুমুর আবার বলছে, এতো বড় গাছের মাথায় উঠলে বাঁচতে পারবি? পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে মারা যাবি! এসব কথা আর কখনো মুখেও আনবি না! মনে থাকবে?

নিসু তার বাবার শরীরের সাথেই লেপ্টে আছে। মায়ের কথায় শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। তপনের পাশে দাড়িয়ে ঝুমুর এবার অন্য প্রসঙ্গে গেল।

বাজারে যেতে হবে, ঘরে খাবার-দাবার সব শেষ। চাল-ডাল-তেল-মাছ-মাংস-সবজি ডিম লবণ কিছুই নেই। বউয়ের কথা শুনতে শুনতে তপন নিসুকে কোলে তুলে নিল। ছেলেকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে বউকে বলল, দুপুরের পর বাজারে যাবো।

তপন একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। সরকারের বাধ্যতামূলক ছুটির কারণে তার কাজ এখন বন্ধ। তাই করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনের এ অবসর। ছুটির প্রথমটায় তপন ভেবেছিল বাসায় তালা ঝুলিয়ে বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে। কিন্তু পকেটে তেমন টাকা না থাকায় সিদ্ধান্ত বদলাতে হল।

তপনের মাসিক বেতন এখনো অফিস থেকে হাতে হাতে নিতে হয়। তার কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন ব্যাংক একাউন্টে পাঠায় না। অফিস বন্ধ থাকায় গত মাসের সেলারি পাওয়ার বিষয়টা তপনের কাছে অনিশ্চিত মনে হচ্ছে। গত মাসের সেলারি কবে কিভাবে দেওয়া হবে তা জানতে একদিন তপন ফোন করেছিল তার অফিসের এক একাউন্স অফিসারকে।

একাউন্স অফিসার বলেছেন কিছুদিন দেরি হবে বেতন পেতে। এদিকে বাড়ির মালিক গত পরশু ভাড়ার জন্য ফোন দিয়েছিল। তাকে অবশ্য বুঝানো হয়েছে কয়েকদিন দেরি হবে ভাড়া দিতে। কিন্তু তপনের পকেট তো প্রায় শূন্য। সে মাসে যে বেতন পায় তা দিয়ে কোনও মতে টেনেটুনে সংসার চলে। তার কোনও জমানো টাকাও নেই যে এ সময় সেখান থেকে সংসারের প্রয়োজনে খরচ করবে। গত মাসে তার স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে এক সহকর্মীর কাছ থেকে।

তপন বাসা থেকে বেরিয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছে। রাস্তায় লোকজন খুবই কম। হেটেই বাজারে যেতে হবে। রিক্সা বা অটো কোনও কিছুই চলছে না। তপন হাটছে আর ভাবছে বউয়ের দেওয়া ফর্দটা নিয়ে সোনালী স্টোরে (মুদি দোকানের নাম) যাবে। গিয়ে দোকানের মালিক আবেদ চাচাকে বলে চাল ডাল তেলসহ অন্যান্য মুদি আইটেম গুলো সব বাকিতে ক্রয় করবে। বাজার করতে গেলে তপন মুদি আইটেমের জিনিসগুলো সব সময় সোনালী স্টোর থেকেই ক্রয় করে। বাকিতেও সওদা করে মাঝে মধ্যে এ দোকান থেকে।

তপন হাটছে আর সোনালী স্টোরের প্রতি অগ্রিম কৃতজ্ঞ হচ্ছে। মুদি দোকানগুলো আমাদের মত নিম্ন আয়ের মানুষদের নিকট বাকিতে জিনিস বিক্রয় করে বলেই বেঁচে আছি। অন্যথায় টাকার অভাবে খাবার কিনতে না পেরে আমাদের মত অনেক মানুষকে প্রতি মাসেই কিছুদিন উপোষ থাকতে হবে।

বাজারে পৌঁছে তপন সোনালী স্টোরের সামনে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। দোকানের সাটার লাগানো। মানে দোকান আজ হয়তো খোলাই হয়নি। কিছুক্ষণ দোকানের সামনে দাড়িয়ে থেকে পাশের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাই সোনালী স্টোর কি আজ খুলেনি? তপনের কথায় দোকানের লোকটা এগিয়ে এসে উত্তর দিল, ওই দোকান দুইদিন যাবত বন্ধ। শুনলাম ঐ চাচা নাকি অসুস্থ্য! হাসপাতালে ভর্তি। নিউমোনিয়া হয়েছে!

কথা শুনে তপন আবারও কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো সোনালী স্টোরের বন্ধ সাটারের দিকে। কথা বলতে থাকা পাশের দোকানের লোকটা এবার ডাক দিয়ে বলল, ভাই আপনার কি কি লাগবে আমার এখান থেকে নিয়ে যান। তপন মাথা নাড়িয়ে বলল, না ভাই কিছু লাগবে না। একটা বিশেষ কারণে চাচার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম।

দোকানি তপনের সাথে আর কোনও কথা না বলে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পাশের এ দোকান থেকে তপন আগে কখনও কোন কিছু ক্রয় করেনি। আজ হঠাৎ বাকিতে জিনিস চাওয়াটা লজ্জার বিষয়! তপন সেখানে আর দাড়িয়ে না থেকে হাটতে হাটতে গলিটার মাথায় গিয়ে ভাবতে লাগলো, কি করা যায় এখন! পকেটে যে টাকা আছে তা দিয়ে তো বাজারের কিছুই হবে না। কোথায় কার কাছে গিয়ে ধার কর্জ করবো এখন!

লকডাউনে ঔষধ মুদি আর কাঁচাবাজার ছাড়া সবকিছুই বন্ধ! অফিসও বন্ধ। যে যার মত চলে গিয়েছে! গ্রামের বাড়িতে ফোন করবো টাকার জন্য? সেখান থেকেও টাকা আসার সম্ভাবনা নেই! তপন বেশ দুঃচিন্তায় পড়ে গেল।

বাজারে মানুষজন নিরাপদ দুরত্ব বজায় না রেখে যে যার মত এদিক সেদিক গায়ে গায়ে ঘেঁষে চলাচল করছে। তপন বুঝতে পারছে না এখন কি করবে! বাজার ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে আরও দু’টো গলি ঘুরে শেষ মাথায় গিয়ে দাড়াল। একজন বৃদ্ধলোক গলি রাস্তারটার এক পাশে ছোট্ট একটা চটের বস্তা বিছিয়ে তার উপর কিছু জিনিস নিয়ে বসে আছে। চটের উপর কয়েকটা পুটলি ও এক লিটারের একটা সয়াবিন তেলের বোতল। পলিথিনে মুড়ানো একটা পুটলিতে পাঁচ কেজি চাল, একটাতে এক কেজি মসুর ডাল, আরেকটাতে দুই কেজি আলু এবং হাফ কেজি লবনের একটা প্যাকেট।

অনেকেই বুড়ো লোকটাকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে, কেউ পাশ ফিরে তাকাচ্ছে কেউ তাকাচ্ছে না। যারা তাকাচ্ছে তাদেরকে ডেকে বৃদ্ধটি মাঝে মাঝে বলছে, ‘লাগলে নিয়ে যান’। তপন প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। বৃদ্ধের পাশে গিয়ে তাকাতেই সে বলল, স্যার, লাগলে নিয়ে যান! স্যার ডাক শুনে তপন বৃদ্ধের প্রতি মনোযোগ দিল আর মনে মনে কিছুটা আক্ষেপ করল, আমার মত ছা পোষাকে আর স্যার ডেকে কি হবে! তপনের আগ্রহ দেখে বৃদ্ধ বলল স্যার চাল ডাল তেল লবন সবই ভালো। কম দামেই দিমু লাগলে নিয়ে যান।

এগুলো বিক্রি করতে এনেছেন কেন? কোথায় পেয়েছেন এগুলো? স্যার মিথ্যা কমু না, এগুলো ত্রাণ পেয়েছি। হাজী সাহেবের ত্রাণ। জিনিস ভালো, চাউল বেশি মোটা না। নিয়া যান সাহেব।

হাজী সাহেব অত্র এলাকার ধনী ব্যবসায়ী। বাজার থেকে একটু দূরে ঈদগাঁ মাঠে বর্তমান সময়টাতে এলাকার দরিদ্র মানুষদের মাঝে ত্রাণ দিয়ে যাচ্ছেন। তপন বস্তার উপরের জিনিসগুলো দেখতে দেখতে আবার বলল, এগুলো তো আপনার বাসায় লাগবে, বিক্রি করছেন কেন?

সাহেব ঘরে আরও কিছু আছে, কিছুদিন চলবে। আমার হাতে কোনও টাকা নাই, কিছু টাকা দরকার তাই বেঁচতে আনছি। অন্য কিছু না সাহেব!

টাকা দিয়ে কি করবেন? এ দুর্যোগে খাবার জিনিস কেনার জন্যই তো সবার টাকা প্রয়োজন। আর আপনি ত্রাণ পেয়ে এগুলো ঘরে না রেখে বিক্রি করে দিচ্ছেন কেন?

সাহেব আমার কিছু টাকা খুব দরকার। কি করবেন এগুলো বিক্রির টাকা দিয়ে? সাহেব আমার পরিবারের (স্ত্রীর) হাঁপানী রোগ। দিনে তিনবার তার গ্যাস (ইনহেলার) নিতে হয়। কিন্তু পাঁচ দিন হল গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। এখন শ্বাস প্রশ্বাসে খুব কষ্ট পাইতেছে। টাকার অভাবে কিনতে পারতেছি না। এগুলো বিক্রি করে একটা গ্যাস কিনবো তার জন্য।

কয়েক মুহুর্ত দাড়িয়ে থেকে তপন জিজ্ঞেস করল, আপনার সবগুলো জিনিস একত্রে কত নেবেন? দেন সাহেব! চার’শ টাকা দেন! দাম শুনে তপন কিছু বলল না। আসলে লোকটি দাম তেমন একটা বেশি চায়নি। কিন্তু তপনের পকেটে আছে তিন’শ পঞ্চাশ টাকা মাত্র। একটু ভেবে তপন বলল, চাচা আপনার ইনহেলার কিনতে কত টাকা লাগবে?

তিন’শ টাকা সাহেব। তপন আবার বলল, চাচা আমার কাছে মাত্র তিন’শ পঞ্চাশ টাকা আছে। যদি দেন এই দামে আমি নিতে পারি। বৃদ্ধ লোকটি তার পুটলিগুলো তপনের বাজারের ব্যাগে তুলে দিয়ে চটের বস্তাটি ভাঁজ করে হাতের মুঠোয় নিল। আর কোনও কথা না বলে তপনের কাছ থেকে তিন’শ পঞ্চাশ টাকা নিয়ে চলে গেল।

বাসায় এসে তপন বাজারের থলেটা রেখে সাবান দিয়ে দু’হাত ধুয়ে নিলো। বাসায় ঢুকতেই নিসু দৌঁড়ে বাবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, দেখি আব্বু কি এনেছো!ঝুমুর ছেলের পেছনে এসে দাড়িয়ে বলল, নিসু বাহির থেকে কোন জিনিস ঘরে আনার সাথে সাথেই ধরতে হয় না। তুমি শুনেছো না করোনা ভাইরাসের কথা! তুমি যাও আমি দেখছি কি এনেছে।

মায়ের কথায় নিসু বাবার বাজারের ব্যাগ আর স্পর্শ করল না। সে টিভির সামনে গিয়ে বসে কার্টুন দেখতে লাগল। ঝুমুর একটা পত্রিকার কাগজের উপর বাজরের ব্যাগটা ঢেলে দিল। বাজারের জিনিসগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তপনকে বলল, আজকে কি সিস্টেমে বাজার করলে তুমি? পাঁচ কেজির মত হবে চাউল, আলু দুই কেজি, ডাল দেখছি এক কেজি, হাফ কেজি লবন আর এক লিটার তেল! চাউল তো এতো কম আনার কথা না। তেলও আরো বেশি আনার কথা। সবজি মাছ মাংস ডিম কিছুই তো নিয়ে আসনি দেখছি।

তপন শুধু বলল, ঝুমুর তোমাকে সব খুলে বলবো! আপাতত এসব দিয়ে যা হয় কিছু রান্না করো। ঝুমুর আর কিছু না বলে পুটলিগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। কিছুক্ষণ পূর্বে তপন যখন বাজারে ছিল তখন ঝুমুর ফেসবুকে একটা ত্রাণের ছবি দেখেছিল। ‘হাজী সাহেবের ত্রানের আইটেম’ শিরোনামে পোস্ট দেওয়া একটা ছবির সাথে তপনের বাজারের আইটেমগুলো পুরোপুরি মিলে গেল।

তপন টিভিতে কার্টুন দেখছিল নিসুর সাথে বসে। ঝুমুর এসে তপনের পাশে দাঁড়াল। তপন ঝুমুরের দিকে একবার তাকিয়ে আবার টিভি স্কীনের দিকে তাকালো। নিসু ‘মটু পাতলু’ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ঝুমুর তপনের পাশে বসলো। ঝুমুরের চেহারাটা খুব ভার হয়ে আছে। দ্বিতীয়বার ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে তপন বিষয়টা বুঝতে পারলো।

তপন ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে হঠাৎ এমন মলিন দেখাচ্ছে কেন? তপনের প্রশ্নের উত্তরে ঝুমুর কিছুই বলল না। ঝুমুর যদিও তপনের চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের ছোট কিন্তু মানসিক ভাবে অনেক ম্যাচিউরড। সে জানে তার স্বামীর মাসিক বেতন খুবই সামান্য। অন্যান্য বউদের মত সে কখনও স্বামীর টাকার হিসাব নিতে চায় না। তপন যেভাবেই বাজার আনে ঝুমুর সেভাবেই পুরো মাস চালিয়ে নেয়। নিজের প্রয়োজনে বা সংসারের প্রয়োজনে অতিরিক্ত খরচের বোঝা ঝুমুর কখনোই চাপিয়ে দেয় না স্বামীর উপর।

ঝুমুর কিছু বলছে না দেখে তপন আবার বলে, ঝুমুর কিছু বলছো না যে? কোনও কারণে কি তোমার মন খারাপ? নাহ্ ! এমনি ভালো লাগছে না! এ মাসে তোমার বেতন হয়নি এখনও? না হয়নি! হবে কি-না তাও বুঝতে পারছি না। অফিস অনিদিষ্টকালের জন্য বন্ধ। আমার যে কোম্পানি! অফিস না খুললে বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

তোমাকে একটা কথা বলি কিছু মনে করো না! হ্যাঁ বলো, কোনও সমস্যা হয়েছে না-কি?

না কোনও সমস্যা হয়নি। আচ্ছা থাক পরে বলব। সন্ধ্যা হয়ে এলো দেখি রান্না ঘরে যাই।

ঝুমুর আর কিছু না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে রান্না ঘরে গেল। তপন ছেলের কাছ থেকে খুব রিকোয়েস্ট করে টিভির রিমোর্ট নিয়ে একটা বাংলা চ্যানেলে কিছুক্ষণ খবর দেখলো। তারপর টিভি বন্ধ করে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলো।

রাতে নিসু ও তার বাবা ঘরের মেঝেতে একটা চাটাই বিছিয়ে খেতে বসেছে। রাতের খাবারের মধ্যে আজ রান্না হয়েছে মোটা ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল। নিসু ও তপনের প্লেটে ঝুমুর খাবার বেড়ে দিচ্ছে। ঝুমুর তপনের প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে দিতে খুব নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি আজ বাজারে না গিয়ে ত্রাণ আনতে গিয়েছিলে? নিসু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তপন কিছুটা লজ্জা জড়িত কণ্ঠে বলল, এগুলো যে ত্রাণের জিনিস তুমি বুঝলে কীভাবে?

তোমার ব্যাগের প্যাকেটগুলোর বাধার ধরণ কোনও দোকানির মত নয়। আর বিকালে ফেসবুকে একজন ত্রাণের একটা ছবি পোস্ট করেছে যার সাথে তোমার আনা আইটেমগুলোর হুবহু মিল রয়েছে।

তুমি ঠিকই ধরেছো, এগুলো হাজী সাহেবের ত্রাণের মাল! তবে আমি এগুলো একজনের কাছ থেকে কিনে এনেছি। কিভাবে কিনলে? ত্রাণের জিনিস বিক্রি হয় না-কি বাজারে? হয় ঝুমুর! অভাবীরা তাদের সাহয্যের জিনিস বা ভিক্ষার জিনিস বাজারে বিক্রিও করে।

ত্রাণের জিনিসগুলো কেনার বিষয়ে তপন সবকিছু খুলে বলল ঝুমুরকে। খেতে খেতে তপন ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে বলল, আজ ত্রাণের মাল বলে কম দামে কিনতে পেরেছি। এই মুহূর্তে টাকার কোনও সংস্থান নেই। জানি না সামনে কি অবস্থা হবে! তখন লজ্জা শরম বাদ দিয়ে হয়তো সত্যি সত্যিই ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে।

ঝুমুর তপনের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা কাজ করো! আমার বিয়ের কানের দুল জোড়া বিক্রি করে দাও! কানের দুল বিক্রি করবো কেন? এছাড়া আর উপায় কি? সামনের দিনগুলোতে কি না খেয়ে থাকবে? এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনও হইনি। সব কিছু বন্ধ। জুয়েলারির দোকানও বন্ধ। চাইলেও তোমার দুল বিক্রি করা সম্ভব না। নিসু বাবা-মায়ের কথাবার্তায় তাদের অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টা বুঝতে পারল।

নিসু খেতে খেতে বলে উঠল, বাবা তুমি আমার মাটির ব্যাংকটা ভেঙ্গে ফেলো। আমার ব্যাংকে অনেক পয়সা জমেছে! তপন ছেলের কথায় হেসে উঠল। খেতে খেতে বলল, নিসু তুমি বড় হয়ে একদিন সত্যিই সত্যিই বড় গাছের চূড়ায় উঠতে পারবে। ঝুমুর কেমন যেন একটা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিসুর খাবারের প্লেটের দিকে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

সারাবিশ্বের সংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।