বরেন্দ্র অঞ্চলে ড্রাগন ফল চাষের মডেল “গ্রীন ওর্য়াল্ডের বসন্তপুর প্রজেক্ট”




রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল খ্যাত গোদাগাড়ীতে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি অধিক লাভজনক পানি সাশ্রয়ী ড্রাগন ফলের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ফল চাষে শিক্ষিত যুবকরা এগিয়ে আসছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাজেউদপুর এলাকায় উদ্দ্যেগতা হেদাইতুল ইসলাম হেলাল ২০১৯ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে ড্রাগন ফল চাষের জন্য ৫ বিঘা জমির উপর গড়ে তোলেন “গ্রীন ওয়ার্ল্ডের বসন্তপুর প্রজেক্ট” এই প্রজেক্টে প্রথমে শুরু করে ড্রাগন ফলের চাষ। ৬/৭ মাস পরে আরো ১৪ বিঘা জমিতে বৃদ্ধি করে ড্রাগন ফলের চাষ। বর্তমানে প্রায় ১৯ বিঘা জমির উপর তার এই কৃষি প্রজেক্ট। তার এই প্রজেক্ট দেখে এ অঞ্চলের বেকার যুবকরা ড্রাগন ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ অঞ্চলে ড্রাগন ফল চাষের মডেল হয়ে দাড়িয়েছে “গ্রীন ওর্য়াল্ডের বসন্তপুর প্রজেক্ট”।
গোদাগাড়ী উপজেলায় বেকার যুবকরা চাকরীর পিছনে না দৌড়ে কৃষিতে মনোনিবেশ করতে শুরু করে।বেশ কয়েক বছর থেকে এ অঞ্চলে পেয়ারা, টমেটো, স্ট্রবেরী, তুরমুজ, শশা, মালটা চাষ হলেও নতুন ভাবে ড্রাগন ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে অনেকে।

এতে করে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমছে, তেমনি আগামীতে দেশের টাকা খরচ করে আমদানী করা বন্ধ হবে। সেইসাথে পুষ্টি ও ভিটামিনের চাহিদাও পুরণ হবে অনেকাংশে। গোদাগাড়ীতে এক যুগের বেশী সময় পূর্বে পানির অভাবে ধান ছাড়া তেমন কোন ফসলের চাষ হত না। সময়ের বিবর্তনের সাথে ঘুরতে থাকে গোদাগাড়ী অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের চাকা। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের অক্লান্ত পরিশ্রমে বরেন্দ্র অঞ্চল সবুজে ভরে উঠতে থাকে। সময়োপযোগী আধুনিক ও জলবায়ুসহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের ফসলের বিস্তৃতিতে ধীরে ধীরে উত্তরের শস্য ভান্ডারে পরিণত হয়েছে এক সময়ের রুক্ষ মাটির অঞ্চল গোদাগাড়ী। এই এলাকার জমি উঁচু হওয়ায় এবং বন্যার পানি মাঠে প্রবেশ না করায় নিরাপদে চাষ করা যাচ্ছে বিভিন্ন জাতের ফল ও ফসল।

এ অঞ্চলের বিভিন্ন মৌজায় এই ড্রাগন ফলের চাষ বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে। গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর গ্রামের মৃত নওসাদ আলীর ছেলে উদ্দ্যেগতা হেদাইতুল ইসলাম হেলাল এর “গ্রীন ওর্য়াল্ডের বসন্তপুর প্রজেক্ট” এ গিয়ে কথা হয় প্রজেক্ট দেখা শুনার দায়িত্বে থাকা শফিউল আলম মুক্তার সাথে তিনি বলেন, ২০১৯ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে প্রজেক্ট তৈরীর কাজ শুরু করেন। জমি ভাল করে চারটি চাষ দিতে হয়। প্রতিটি সারি ও বেডের দুরত্ব ৩মিটার বাই ৩মিটার পদ্ধতি অনুসরন করা হয়। চারপাশের মাটি তুলে বেড তৈরী করতে হয়। এরপর বেডের মাঝখানে শক্ত সিমেন্টের খুঁটি দিতে হয়। খুটি স্থাপনের পূর্বে বেডে ১০-১২ কেজি জৈব সার মাটির সাথে মিশ্রন করে ১০দিন রাখতে হয়। এর ড্রাগনের কাটিং রোপন করতে হয়। রোপন করে প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন বেডে পানি দিতে হয়। পরের সপ্তাহে ৩দিন পানি দেয়ার পরে সমস্ত জমি পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হয়। তবে জমিতে কোনভাবেই পানি জমে থাকতে দেয়া যাবেনা বলে জানান তিনি। এর পর খরা মৌসুমে মাসে দুইবার করে পানি দিলেই চলে।
ভালো জাতের কাটিং হলে রোপনের ১১ মাসের পর থেকে ফল তোলা শুরু হয়। তবে রোপনের ৩-৪ মাসের মধ্যে ফুল আসলে তা ভেঙ্গে দেয়াই ভাল বলে জানান। বিঘাপ্রতি কাটিং রোপন থেকে শুরু করে ফল উত্তোলন পর্যন্ত প্রায় তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়। তিনি বলেন, এপ্রিল মাস হতে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সার্বক্ষণিক গাছে ফুল ও ফল আসে। ৫ বিঘাতে এখন পর্যন্ত সাড়ে ১০ টন ফল বিক্রি হয়েছে। যা থেকে আয় হয়েছে ২১ লক্ষ টাকা। বর্তমানে যে ফল গুলো ২ টি ১ কেজি সেই ফল প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা, ৩ টিতে কেজি সেগুলো প্রতি কেজি ৩৮০ টাকা, ছোট গুলো ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে প্রায় দুই টন ড্রাগন ফল পাওয়া যায়। তিনি আরো জানাই এই প্রজেক্টে ১৪ বিঘা জমিতে ৬ মাস বয়সের ড্রাগন ফলের গাছ রয়েছে। প্রথমে ঝিনাইদহ থেকে ড্রাগন গাছের কাটিং এনে লাগানো হয়েছিল। এখন এই প্রজেক্টের গাছ থেকে কাটিং করে লাগানো হচ্ছে। এমনকি এখান থেকে কাটিং অন্যরা নিয়ে গিয়ে ড্রাগন ফলের চাষ করছে।

শফিউল আলম মুক্তা বলেন, ড্রাগন গাছ ও ফলের উল্লেখযোগ্য কোন রোগবালাই নাই। এরজন্য রাসায়নিক সার ও কিটনাশক এই বাগানে ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ অর্গানিকভাবে এই ফলের চাষ করা হচ্ছে। সেইক্ষেত্রে এই ফল একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক এবং সেচ একেবারেই কম লাগায় খরচ অনেক হয়।

“গ্রীন ওর্য়াল্ডের বসন্তপুর প্রজেক্ট” এ ড্রাগন ফলের পাশাপাশি রয়েছে এ্যকাডো ফলের গাছ ১৬০ টি, রামভুটান ফলের গাছ ১০ টি, মরিফা ফলের গাছ ১৫ টি, থাইল্যান্ডের পরশিমুন ফলের গাছ ৫০ টি, খাটো নারিকেলের গাছ ১০ টি, তাইওযানের শীতকালিন কাঠাল গাছ ২০ টি, শীতকালিন আম গাছ ৫০ টি, বরই ( বরসুন্দরী) গাছ ২০ টি, লেবু (সিডলেস, এলাচি, চাইনা-৩ জাতের) গাছ ২ হাজার টি, বারি-১ জাতের মাল্টার গাছ ৩০০ টি, গুজরাটি খেজুর ( হলুদ খেজুর) গাছ। এছাড়াও রয়েছে ৪০০ টি কফির গাছ।

প্রতিদিন এ প্রজেক্ট দেখেতে আসে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষক, গবেষক ও দর্শনার্থীরা।

উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষি উপ-সহকারী আবুল হোসেন বলেন- ড্রাগন একটি উচ্চ মূল্যের সুস্বাদু বিদেশি ফল। এই ফল ঔষধি গুণসম্পন্ন ফল। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা মানুষের শরীরের জন্য ভালো। একবার লাগানো হলে প্রায় ১৫-২০ বছর ফল দেয়। পানি কম লাগে। বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষের উপযোগী। বরেন্দ্র অঞ্চলে যেহেতু পানির সংকট রয়েছে তাই ড্রাগন ফলের চাষ এই এলাকার জন্য একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে চাষ করা যেতে পারে। কৃষি বিভাগ বরেন্দ্র অঞ্চলে ড্রাগন ফলের স¤প্রসারনে কৃষকদের পরামর্শ এবং সহযোগিতা করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, প্রচুর পরিমাণ পুষ্টিগুনসম্পন্ন এই বিদেশি ফল লিভারের রোগ ও ডায়াবেটিকস-এর জন্য উপকারী। দিন দিন শিক্ষিত ও শহুরে সমাজে এই ফলের গুরুত্ব বাড়ছে বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, গোদাগাড়ীতে প্রায় ২.৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। বরেন্দ্র মাটিতে খরাসহিষ্ণু ড্রাগন সহজেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে বলে বর্তমানে গোদাগাড়ী উপজেলায় ড্রাগন চাষের ভালো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

ড্রাগন ফলের পুষ্টি গুনঃ প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলের সাদা বা লাল অংশে ২১ মি.গ্রা. ভিটামিন সি পাওয়া যায় যা দৈনিক ভিটামিন সি’র চাহিদার ৩৪ শতাংশ পূরণ করতে সাহায্য করে। ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে যে পরিমাণ ভিটামিন সি পাওয়া যায় তা একটি কমলার সমান বা তিনটি গাজরের চেয়ে বেশি ভিটামিন সি সরবারহ করতে সক্ষম। ভিটামিন সি’র মাত্রা বেশি থাকায় এই ফল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মানসিক অবসাদ দূর করে এবং ত্বক সুন্দর রাখতে সাহায্য করে।

প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে ৩ গ্রাম আঁশ থাকে যা দৈনিক চাহিদার ১২ শতাংশ। ড্রাগন ফলের আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিকারক হিসেবে কাজ করে।

এই ফলের কালো বীজে থাকে ল্যাক্সেটিভ ও পলিআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটি অ্যাসিড যা হজমে সাহায্য করে ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধের সহায়ক।

প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে জলীয় শতাংশ থাকে ৮৭ গ্রাম, প্রোটিন ১.১ গ্রাম, ফ্যাট ০.৪ গ্রাম (বলতে গেলে ফ্যাট নাই) এবং কার্বোহাইড্রেট ১১.০ গ্রাম।

এছাড়াও এতে বেশ কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপদান থাকে যা মানবদেহের সুস্থতার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।
প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে ০.০৪ মি.গ্রা. ভিটামিন বি ১, ০.০৫ মি.গ্রা. ভিটামিন বি ২, ০.০১৬ মি.গ্রা ভিটামিন বি ৩ এবং ২০.০৫ মি.গ্রা. ভিটামিন সি পাওয়া যায়।

ড্রাগন ফল আয়রনের ভালো উৎস। ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে ১.৯ মি.গ্রা. আয়রন থাকে। এছাড়াও এতে ক্যালসিয়াম থাকে ৮.৫ মি.গ্রা. এবং ফসফরাস থাকে ২২.৫ মি.গ্রা.।

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।