রোহিঙ্গা গণহত্যার তিন বছর: গ্রামগুলোর নাম মুছে দেয় মিয়ানমার, মেনেও নেয় জাতিসংঘ!

মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দূত- ইয়াংঘি লি নিজ সংস্থার প্রতিও অভিযোগের আঙ্গুল তুলে বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় জাতিসংঘ তাতে বাঁধা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই এর সমান দায় জাতিসংঘের কাঁধেও বর্তায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক:নিজস্ব প্রতিবেদক:
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৪০ অপরাহ্ণ, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০
উগ্র বৌদ্ধ দাঙ্গাবাজ আর সামরিক বাহিনী যৌথভাবে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়। ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট




নাফ নদীর তীরে ছোট্ট এক সাজানো গ্রাম ছিল- কান কিয়া। তিন বছর আগে এই গ্রামটিও ছাড়তে হয় রোহিঙ্গাদের। সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী মিলিশিয়াদের গণহত্যা আর বর্বরতার মুখে পালায় গ্রামটির সকল অধিবাসী। পালিয়ে আসে নদীর এপাড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে। আর কান কিয়াকে আগুনে পুড়িয়ে, বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। সেখানেই শেষ নয়, গতবছর গ্রামটির নামও আনুষ্ঠানিক মানচিত্র থেকে মুছে ফেলেছে দেশটির সরকার- জানিয়েছে জাতিসংঘ।

নাফ নদী থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে ছিল কান কিয়া। ২০১৭ সালের এই গ্রামটির অধিবাসীদেরও পালাতে হয়, অন্য আরও ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাদের মতো। জাতিসংঘ এ সময়ে সংগঠিত নিষ্ঠুরতাকে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের ‘প্রকৃত সংজ্ঞা’ বলে উল্লেখ করে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এখন গণহত্যার অভিযোগের মুখে রয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতে। তবে তাদের পক্ষ থেকে বরাবরই অযুহাত দেওয়া হয়েছে যে, তারা নাকি শুধু জঙ্গি নির্মুল অভিযান পরিচালনা করেছিল।

কান কিয়ার জায়গায় আজ দাঁড়িয়ে আছে মিয়ানমারের সরকার এবং সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু দালান। আছে কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা এক পুলিশ ঘাঁটি। সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত গুগল আর্থের উপগ্রহ চিত্রেই যা স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও প্ল্যানেট ল্যাবস সূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক চিত্রগুলো মিলিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

মিয়ানমারের সর্ব উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের গ্রামটিতে এখন বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাছাড়া, স্থানটি এটি এতোই ছোট যে- গুগুল ম্যাপে এর কোনো নামও নেই।

জাতিসংঘের মানচিত্র প্রস্তুতকারী দল সংস্থাটির শরণার্থী সংস্থা- ইউএনএইচসিআর, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সহযোগীদের জন্য ম্যাপ তৈরি করে থাকে। চলতি বছর এমনই একটি মানচিত্র প্রস্তুত করা হয়- মিয়ানমার সরকারের দেওয়া নানা ম্যাপের উপর ভিত্তি করে। সেগুলোতে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া কান কিয়ার কোনো নাম ছিল না। বরং একে দেখানো হয় কাছাকাছি বড় শহর মুয়াংডো’র অংশ হিসেবে।

২০১৭ সালে কান কিয়ার মতো কমপক্ষে ৪০০ রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। উপগ্রহ চিত্রের ভিত্তিতে এমনটাই জানাচ্ছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ইতোমধ্যেই, কয়েক ডজনের বেশি গ্রামের নাম নিজেদের তৈরি আনুষ্ঠানিক মানচিত্র থেকে সরিয়ে ফেলেছে মিয়ানমার।

মিয়ানমারের উদ্দেশ্য কী?

‘ওরা চায় আমরা যেন আরও কোনোদিন নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে না পারি’ বলছিলেন রোহিঙ্গা ধর্মীয় নেতা ও কান কিয়ার পার্শ্ববর্তী এক গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিক। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রফিক এভাবেই মিয়ানমার সরকারের আসল আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

রাখাইন রাজ্যে পুনঃনির্মাণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। গ্রামের নাম মুছে দেওয়া বা রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সরকারি নীতি সম্পর্কে করা রয়টার্সের প্রশ্নগুলোর তারা উত্তর দেয়নি। মন্ত্রণালয়টি প্রশ্নগুলো জনপ্রশাসন বিভাগের কাছে করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু যোগাযোগ করা হলে সরকারি কর্তৃপক্ষটি কোনো সাড়া দেয়নি।

মিয়ানমার সরকারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি’র দলের একজন জনপ্রতিনিধির কাছেও এসব প্রশ্ন করে রয়টার্স। তিনিও কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি।
চলতি বছরের শুরু থেকে জাতিসংঘের মানচিত্র বিভাগ কমপক্ষে তিনটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে। সবগুলোতেই দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর নাম হয় মুছে দেওয়া হয়েছে, নাহলে নতুন নামে তাদের চিহ্নিত করছে মিয়ানমার সরকার।

জাতিসংঘ জানায়, একারণেই গত জুনে রাখাইন রাজ্যের বেশকিছু নতুন ম্যাপ তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি দেশটির সরকারের এমন নীতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কী প্রভাব ফেলবে, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক রোহিঙ্গা অধিকার গোষ্ঠী- আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের তরফ থেকে জাতিসংঘের কাছে গ্রামের নাম মুছে ফেলা সংক্রান্ত অভিযোগ যাওয়ার প্রেক্ষিতে- এ পদক্ষেপ নেয় বিশ্ব সংস্থাটি। পাশাপাশি জাতিসংঘ জানিয়েছে, নাম পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণাটি এখনও চলমান আছে।

মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দূত- ইয়াংঘি লি এর আগে বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাতে ফিরতে না পারে, সেজন্যেই স্থানের নাম পরিবর্তন করে চলেছে মিয়ানমার সরকার। এতে রোহিঙ্গারা এককালে যে এসব স্থানে বাস করতো- তার কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট থাকবে না।

‘এটা তাদের আদি পরিচয় মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ’ তিনি জানিয়েছিলেন।

এসময় লি নিজ সংস্থার প্রতিও অভিযোগের আঙ্গুল তুলে বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় জাতিসংঘ তাতে বাঁধা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই এর সমান দায় জাতিসংঘের কাঁধেও বর্তায়।

” দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এমন কোনো নেতৃত্ব ছিল না- যিনি মিয়ানমারকে থামিয়ে দিয়ে বলতে পারতেন- যথেষ্ট হয়েছে আর নয়, আমরা এই ন্যাক্কারজনক কাজ আর মেনে নেব না।”

মিয়ানমারের দেওয়া মানচিত্র অনুসারে কেন জাতিসংঘ মানচিত্রে নাম পরিবর্তন করলো? কেনইবা তা নিয়ে জাতিসংঘ কোনো প্রতিবাদ করেনি- তা জানতে সংস্থাটির শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেয় রয়টার্স। তারা কেউই এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জাতিসংঘের ব্যাখ্যা:

মিয়ানমারে জাতিসংঘ মিশন প্রধান- ওলা আলমগ্রেন জানান, ”তিনি গ্রামের নাম মুছে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের কাছে প্রতিবাদ করেননি, তবে তাদের প্রতি শরণার্থী প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছিলেন।”

এব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতারেজের মুখপাত্র স্টিফান দুজারিক বলেন, ”কিছু গ্রামের নাম পরিবর্তন করে তা ওয়ার্ড হিসেবে দেখানো ছিল- রুটিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের অংশ। মাঠ পর্যায়ে জাতিসংঘের ত্রাণকর্মীদের মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। উভয়পক্ষে যেন ভুল বোঝাবুঝি তৈরি না হয়, তা চিন্তা করেই স্থানের নাম পরিবর্তন বা মুছে ফেলা নিয়ে মাথা ঘামাননি জাতিসংঘের মানচিত্র প্রস্তুতকারী দল।”

‘বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ এভাবেই স্থানীয় সরকারের দেওয়া আনুষ্ঠানিক নাম অনুসরণ করে- মানচিত্র তৈরি করে আসছে’ তিনি যোগ করেন।

দুজারিক জানান, গ্রামের নাম পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তার আইনি স্বীকৃতিও বদলে দেওয়াটা মিয়ানমারের উদ্দেশ্য হতে পারে। আদি নিবাসের ঠিকানা ছাড়া রোহিঙ্গারা কোথায় ফিরে আসার দাবি করবে? এভাবেই শরণার্থী প্রত্যাবর্তনকে জটিল করে তুলছে দেশটি। তবে তিনি এই ‘জটিলতার’ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে আগ্রহ দেখাননি।

  • সূত্র: রয়টার্স

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।