এসএমই প্যাকেজ বাস্তবায়নে যুক্ত হচ্ছে এনজিও

ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম করেও ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দিতে আগ্রহী করতে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রভাতী নিউজ অনলাইন রিপোর্টঃপ্রভাতী নিউজ অনলাইন রিপোর্টঃ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৬:৪৬ অপরাহ্ণ, ০৮ ডিসেম্বর ২০২০




হাইলাইটস:

  • দেশে এসএমইর সংখ্যা ১.১৬ কোটি
  • কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তা ১.০৭ কোটি
  • সিএমএসএমইখাতে কর্মসংস্থান ৩.১৭ কোটি, যা মোট কর্মসংস্থানের
  • কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের গড় ঋণ চাহিদা ১.৬০ লাখ টাকা

দু’দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য সরকার ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজের অর্ধেকও বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম করেও ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দিতে আগ্রহী করতে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ অবস্থায় সিএমএসএমই গুলোর কাছে প্রণোদনার ঋণ বিতরণে এনজিওগুলোকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

কোভিড সংকট মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রণালয় আয়োজিত ধারাবাহিক কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে গত বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সভায় সিএমএসএমই প্যাকেজ বাস্তবায়ন নিয়ে যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়, তা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই খাত কোভিডের অভিঘাত মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়াতে না পারায় অর্থনীতিতেও গতি ফিরছে না বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।

অর্থবিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ‘সিএমএসএমই প্যাকেজ বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে আমরা হতাশ। ব্যাংকগুলো মাইক্রো ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম গঠন করলেও মাত্র ৮টি ব্যাংক এই স্কিমে যুক্ত হয়েছে।’

তিনি জানান, এ অবস্থায় পল্লী কর্মসংস্থান ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), এসএমই ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন ও মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাইক্রো ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এসব সংস্থার সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী এনজিওগুলোর নেটওয়ার্কিং আছে এবং এসব সংস্থা এনজিওগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে থাকে। তাই এদের সম্পৃক্ত করে খুব দ্রুত এবং সহজে কুটিরশিল্প ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের কাছে চলতি মুলধনের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) যোগান দেয়া সম্ভব হবে।

এ ব্যাপারে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘কুটির ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে প্রণোদনা প্যাকেজের সুফল পৌঁছাতে পিকেএসএফসহ এ ধরণের রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের প্রস্তাব আমি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও দিয়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়া এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।’

সিএমএসএমই খাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল যোগান দেয়ার জন্য গত এপ্রিলে ঘোষিত এই প্যাকেজের ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ শতাংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। বাকি ৪ শতাংশ সুদ পরিশোধ করবেন ঋণগ্রহীতারা।

মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা মূলত এনজিও লোনের উপরই ভরসা করেন। স্বাভাবিক সময়েও তারা ব্যাংক থেকে ঋণ কম নেওয়ার চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক সংস্থা থেকে ঋণ নেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬ লাখ উদ্যোক্তাকে ১৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো।

মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অধীনে ব্র্যাক, আশা এবং ব্যুরো বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মাইক্রো ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তা নিয়ে কাজ করে।

পিকেএসএফ-এর সাথে যুক্ত প্রায় ২০২ টি সংস্থা সারাদেশে প্রায় সব উপজেলায় ১০,৩৭০ টি শাখার মাধ্যমে কুটির এবং মাইক্রো শিল্প উদ্যোক্তাকে ঋণ বিতরণ করে আসছে।

ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুরু থেকেই করে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তাদের বড় অংশেরই ব্যাংক হিসাব নেই। জামানত দেয়ার মতো কোনো সম্পদও নেই।

এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের গড় চাহিদা দেড় লাখ টাকার মতো। ব্যাংকগুলো এতো অল্প টাকার ঋণ বিতরণে আগ্রহীও নয়। এ কারণে এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে এনজিওদের সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। পিকেএসএফ, এসএমই ফাউন্ডেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও এনজিওদের সম্পৃক্ত করতে অর্থমন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই তহবিলের ১৪ হাজার কোটি টাকা কুটিরশিল্প ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের মধ্যে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহ করার কথা। এখন পর্যন্ত এই তহবিলের মাত্র ৮,২১৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যার বড় অংশই গেছে মাঝারি শিল্পখাতে।

ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ না দেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রণালয় আয়োজিত কর্মশালায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

এসএমই প্যাকেজ থেকে ঋণ বিতরণ কাঙ্খিত মাত্রায় নয় স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির সভায় বলেন, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল তহবিল থেকে যে হারে ঋণ দেয়া হচ্ছে সে হারে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া যাচ্ছে না।

অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দের যে অংশ এখনও বিতরণ হয়নি, তার উল্লেখযোগ্য অংশ এনজিওদের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। এক্ষেত্রে টার্মস এন্ড কন্ডিশন তৈরির কাজ শুরু করেছে অর্থবিভাগ। বিদ্যমান ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের অর্থের পরিমাণ বাড়ানো ও আরো বেশি ব্যাংককে অন্তর্ভূক্ত করার উদ্যোগও নেবে অর্থমন্ত্রণালয়।

এসএমই প্যাকেজের ঋণ বিতরণে এনজিওদের সম্পৃক্ত করতে গত আগস্ট মাসে অর্থমন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব করে পিকেএসএফ। সংস্থাটি তখন বলেছিল, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে মাইক্রো এবং কুটির শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা ১৪ হাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।

এতে সুপারিশ করা হয়, এই ঋণের উপর ব্যাংকগুলি সরকারের কাছ থেকে ৫% সুদের ভর্তুকি পাবে এবং ব্যাংকগুলো মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটগুলোকে (এমএফআই) ৬ শতাংশ সুদ হারে তহবিল দেবে।

এমএফআই’গুলি এরপরে এই টাকা (ব্যাংক থেকে ধার করা) ৯ শতাংশ সুদহারে কুটির এবং মাইক্রো উদ্যোক্তাদের কাছে বিতরণ করবে।

পিকেএসএফ সুপারিশ করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করবে।

সুপারিশগুলি বাস্তবায়িত হলে, এমএফআইগুলি ১০ থেকে ১৩ শতাংশ প্রশাসনিক ব্যয় এবং ১ থেকে ২ শতাংশ ঋণ একীকরণ রিজার্ভের ফলে ৪ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে।

ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পিকেএসএফ সুপারিশ করেছে, ব্যাংকগুলি তিন বছরের মেয়াদে মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটগুলোকে তহবিল সরবরাহ করবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছয় মাসের ছাড়ের সময়কালে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ১০ টি সমান কিস্তিতে এই অর্থ ফেরত দেবে। এমএফআইগুলি কুটির এবং মাইক্রো উদ্যোক্তাদের দুই বছরের মেয়াদে ঋণ সরবরাহ করবে।

মাইক্রো ফাইন্যান্স ইন্সটিটিউটগুলোর প্লাটফর্ম ক্রেডিট এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটিতে (এমআরএ) নিবন্ধিত ৭৫৯টি এনজিও ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের কুটিরশিল্প ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ বিতরণ সম্ভব নয়। আমরা মুনাফা ছাড়াই এ প্যাকেজ বাস্তবায়নে শরিক হতে চাই। কারণ, নতুন ঋণ দিয়ে কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করাতে পারলেই কেবল আমরা পুরনো ঋণ আদায় করতে পারব।’

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।