‘পুরুষত্বের সংকট’? চীন বলছে ছেলেদের মধ্যে মেয়েলি স্বভাব

ছেলে শিশুদের জন্যে শরীরচর্চা ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেছেন, নারী শিক্ষক এবং পপ কালচার- ছেলেদের ‘দুর্বল, ভঙ্গুর আর নম্র’ স্বভাবে পরিণত করছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:০৯ অপরাহ্ণ, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
২০১৯ সালে চীনের জিয়ামেন শহরে আয়োজিত একটি শারীরিক প্রশিক্ষণ শিবির। ছবি: হেক্টর রেটামাল/ এএফপি/ ভায়া গেটি ইমেজেস




বেইজিংয়ে স্কুল শেষে শারীরিক প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে কয়েকজন বালক। ছেলেদের পুরুষত্ব বিকাশে কঠোর পরিশ্রমকে আবশ্যক মনে করছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ছবি: গিলিস সাবরি/ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশটির স্কুলগামী বালকদের একটি বড় অংশ ‘মেয়েলি’ স্বভাবের হয়ে উঠেছে। তাই তাদের ‘কঠোর’ করে তুলতে চাইছে কর্তৃপক্ষ।

চীনা গণমাধ্যম ও শিক্ষাবিদেরা একে ‘পৌরুষত্বের সঙ্কট’ বলে অবহিত করেছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় বালকদের মধ্যে ইয়াং বা পুরুষালি শক্তি জাগিয়ে তুলতে; আরও বেশি ক্রিড়া প্রশিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। একইসঙ্গে, করা হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা ক্লাসগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ।

শীর্ষ এক সরকারি কর্মকর্তার মতে, ‘বালকদের মেয়েলি হয়ে ওঠা ঠেকানোর জন্যেই এ পরিকল্পনা।’ গত সপ্তাহে পরিকল্পনাটি প্রকাশিত হয়। বাস্তবায়নের সময়সীমা-সহ বিস্তারিত বিষয়াদি সেসময় জানানো হয়নি। তবে প্রকাশের পর এর পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক গণমাধ্যমে। চলছে অভিভাবকদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক। চীনের টুইটার খ্যাত মাইক্রোব্লগিং সাইট ওয়েইবো’তে এনিয়ে একটি হ্যাশট্যাগ ১৫০ কোটিবার দেখেছেন ব্যবহারকারীরা।

পরিকল্পনার সমর্থনকারী এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘বিদেশি আগ্রাসনের হুমকি এখন বাড়ছে। আর মেয়েলি স্বভাবের এই বালকেরা বড় হয়ে দেশরক্ষা করতেও পারবে না।’ সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত অন্যদের কাছে এটি লিঙ্গ বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, লিঙ্গভিত্তিক প্রচলিত অসাম্যের ধারণা অনুসারেই করা হয়েছে সরকারি প্রস্তাবনা।

এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা নিয়ে সন্দিহান। এনিয়ে প্রশ্ন তুলে সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি’ কর্তৃপক্ষ গত শনিবার তাদের ওয়েইবো পেজে লেখে, “শিক্ষার মাধ্যমে শুধু ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ গড়ে হিসেবে কাউকে গড়ে তোলা মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না। বরং দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।

সাম্প্রতিক কালে সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। তবে এজন্য এক সন্তান নীতির আওতায় জন্ম নেওয়া ছেলে শিশুদের আহ্লাদে বখে যাওয়া ও দুর্বল মনোভাবের বলে মনে করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরফলে পুরুষত্ব নিয়ে এক কট্টর ধারণার উদয় হয়। তাই টেলিভিশন সম্প্রচারে পুরুষ পপ তারকাদের কান ফোঁড়ানোও ঝাপসা করে দেখানো হয়। রূপচর্চা সচেতন অনেক অভিনেতাকে ‘লিটল ফ্রেশ মিট’ মতো অপমানজনক সম্বোধন করা হয় জনসাধারণের আলোচনায়। অনেক অভিভাবক এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের আদলে গড়ে ওঠা শরীরচর্চা কেন্দ্রে ছেলে শিশুদের পাঠাচ্ছেন। এতে তাদের সন্তানেরা ‘প্রকৃত পুরুষ’ হতে পারবে বলেই বিশ্বাস তাদের।

গেল বছরের মে’তে চীনের পিপলস কনসালটেটিভ কনফারেন্সের স্ট্যান্ডিং কমিটির শীর্ষ প্রতিনিধি শি জেফু ‘পুরুষ সন্তানদের মেয়েলিভাব মোকাবিলা’ শীর্ষক প্রস্তাবনা দেন। তার উপর ভিত্তি করেই সাম্প্রতিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জেফুর পরিকল্পনায় ‘অনেক, অনেক পুরুষ শরীরচর্চা প্রশিক্ষক নিয়োগ দিয়ে’ বিদ্যালয়ে পুরুষালী আচরণ উদ্বুদ্ধ করার সুপারিশটিও ছিল।

এব্যাপারে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “কিন্ডারগার্ডেন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকদের প্রাধান্য এবং পপ কালচারের ‘সুন্দর বালক’ হয়ে ওঠার জনপ্রিয় প্রবণতা থেকে পুরুষ শিশুরা ‘দুর্বল, ভঙ্গুর আর নম্র’ স্বভাবের হয়ে উঠছে। ছেলে শিশুরা আর যুদ্ধক্ষেত্রের নায়ক হতে চায় না, বলেও তিনি আফসোস করেন। আর জানান, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামীদিনে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

গেল বছর রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা শিনহুয়া’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, অপেক্ষাকৃত কম বেতনের শরীরচর্চা প্রশিক্ষক পেশার প্রতি পুরুষদের আগ্রহ কম থাকায়, নারীদের প্রাধান্য দেখা দিয়েছে। লিঙ্গ বৈষম্য মূলক জন্মনীতি এবং ধ্যান-ধারণা থেকেই নারীরা এখাতে বেশি চাকরি পান, বলেও তুলে ধরা হয়। ইতোপূর্বে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমটি ছেলে শিশুদের মেয়েলি স্বভাবের জন্যে ভিডিও গেম, নীলছবি এবং কঠোর শারীরিক প্রশিক্ষণের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরে।

নারী প্রশিক্ষকরা কঠোর শরীরচর্চা করাতে পারেন না বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে চীনা শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা সূত্রে।

  • সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।