‘বেঁচে থাকার লড়াই করছি’: আম্পানের পর সীমাহীন দুর্ভোগ কাটেনি চিংড়ি চাষিদের

খুলনাসহ পাশের সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় ৩ লাখ চিংড়ি চাষির মধ্যে ৭০ শতাংশই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা

প্রভাতী নিউজ অনলাইন রিপোর্টঃপ্রভাতী নিউজ অনলাইন রিপোর্টঃ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১
নয় মাস পানিতে তলিয়ে থেকে ঘের সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান




মহামারি হানা দেওয়ার আগে গেল বছরের ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলে ছিল চিংড়ি চাষিদের রমরমা অবস্থা। স্থানীয় ও রপ্তানি বাজারের চাহিদায় ছিল ভালো আয়েরও সুযোগ।

বাজার অনুকূল থাকায় স্বল্প মূলধন নিয়ে অনেক গ্রামীণ যুবক যোগ দেন চিংড়ি চাষে। তাদেরই একজন খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা মজনু সর্দার। উপকূলের সংগ্রামী জীবিকার বিবেচনায় তখন তিনি যথেষ্টই আয় করতেন। অন্তত, যেটুকু আয় হতো- তা দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবারের খাদ্য, বস্ত্র আর শিক্ষার চাহিদাও পূরণ করা যেতো।

মজনুর সেই সুদিন ঝড়ো বাতাসে উড়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে মাটির তৈরি আর পাতায় ছাওয়া কুঁড়েঘরে থাকেন কপোতাক্ষ নদীর তীরে। গেল বছরের মে’তে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর থেকে এখানেই ঘর বেঁধেছেন। আম্পানে তার আগের ঘর ভেসে যায়, তলিয়ে যায় চিংড়ি চাষের জমিও।

“জমি পানির নিচে ছিল নয় মাস ধরে। পলি জমে তিন-চার ফুট সমান। আমার ঘেরের সব কিছু শেষ। আবার সব ঠিকঠাক করতে হলে অনেক টাকা লাগবে। এদিকে বেঁচে থাকতেই অনেক ধার করে ফেলেছি। দেনার পাহাড় সমান বোঝা আমার ঘাড়ে। কে আমাকে এরপর চিংড়ি চাষের জন্য টাকা দেবে?” প্রশ্ন রাখেন মজনু।

৩৫ বছরের মজনু এখন পরিবারের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে রোজ দিন-মজদুরির কাজ খুঁজতে বের হন।

এ গল্প শুধু মজনুর একার নয়। খুলনাসহ পাশের সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় ৩ লাখ চিংড়ি চাষির মধ্যে ৭০ শতাংশই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অনেকের নেই নিজের জমি। ইজারার জমিতে চাষ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। রপ্তানি বাজার সচল থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে ছিল না দুর্ভাবনা। কিন্তু, সবকিছু বদলে দেয় কোভিড-১৯। লকডাউনে বন্ধ হয় রপ্তানি বাজার।

গেল বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চিংড়ি রপ্তানি আদেশের ৮০ শতাংশ বা ৫৪ মিলিয়ন ডলার বাতিল করা হয়।

রপ্তানি বন্ধে স্থানীয় বাজারে চিংড়ির দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বিশেষ করে, আম্পান আঘাত হানার কয়েক সপ্তাহ পরই দেখা দেয় নাটকীয় দরপতন। আম্পান ছিল গত এক শতকের মধ্যে পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানা সবচেয়ে তীব্র ঘূর্ণিঝড়। চিংড়ি ঘের, ফসলী জমি, মাছ ধরার নৌকা, বসতবাড়ি সব ধ্বংস হয় জোয়ারের প্রচণ্ড স্রোতে।

মঞ্জু জানান, “আম্পানের কারণেই এখন সবচেয়ে বড় বিপদ আমাদের। গেল বছর ভাইরাস আর সাইক্লোন আমাকে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে। এখন আমার কাছে চিংড়ি চাষের মূলধন নেই। দেনার বোঝা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। অন্য চিংড়ি চাষির ঘেরে দিন-মজদুরি করি। আগামীদিনে কী করব, কী হবে- ভাবতেও ভয় হয়।”

তিনি এখনও অস্থায়ী আবাসে পরিবার নিয়ে থাকলেও, সর্বস্ব হারানো অনেক চিংড়ি চাষি কাজের সন্ধানে এসেছেন রাজধানী ঢাকায়।

কয়রা উপজেলার নারী চিংড়ি চাষি ৩৬ বছরের মুসলিমা বেগম। মঞ্জুর মতো তারও ছিল স্থায়ী আয়ের সুযোগ। কিন্তু, এখন তার স্বামী মোশাররফ হোসেনের দিন-মজদুরির আয়েই পরিবারটি চলছে। মাঝে মাঝে মোশারফ কোনো কাজই পান না।

“এমন সঙ্কটে কোনোদিন পড়িনি। আম্পানে আমার এক লাখ টাকার চিংড়ি নষ্ট হয়। তারপর দেনা করা ছাড়া উপায় ছিল না। এবছরও চিংড়ি চাষ করতে পারব না। কীভাবে বেঁচে থাকব কে জানে।”

মুসলিমা বলেন, “পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য দৈনিক খাবারের জোগান দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। আগে বাড়ির কাছের সবজি বাগানে শাক-সবজির চাষও করতাম। সেখান থেকে টাটকা সবজির যোগান আসতো। আম্পানে সব গেছে, এখন সব বাজার থেকে কিনতে হয়। সবকিছুর দাম সেখানে চড়া, তাই আমাদের মতো অসহায় মানুষের পক্ষে বেশি কিছু কেনা সম্ভবও নয়।

সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা ৪৫ বছরের নূর ইসলাম। তিনিও চিংড়ি চাষি ছিলেন। তার মতে, ব্যবসার উপায় একেবারে শেষ।

“গত কয়েক বছর ধরে চিংড়ি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। নানা সময়ে ছোটখাটো অনেক সমস্যা এসেছে। একবার চিংড়ির মধ্যে নতুন এক জীবাণুর সংক্রমণে খুব লোকসানও হয়। কিন্তু, কঠোর পরিশ্রম করে আবারও তা কাটিয়ে উঠি। এক বছর ব্যবসা খারাপ হলে, পরের বছর তা কাটিয়ে ওঠা- এভাবেই চলছিল। কিন্তু, এবার আম্পান আমাকে পথে বসিয়েছে।”

আম্পানের পর উপকূলের চাষিরা ঘুর্ণিঝড় থেকে রক্ষা পাওয়া যেকোনো সম্পদ বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে দিন কাটাচ্ছেন। নূর ইসলাম তার শেষ গরুটাও বেঁচেছেন কিছুদিন আগে। সেখান থেকে কিছু টাকা দিয়ে শোধ করেছেন জমি মালিকেরা পাওনা টাকা। বাকি টাকায় একটি নৌকা কিনে এখন নদী পাড়াপাড়ের কাজ করেন। এতে দিনে আয় হয় সর্বোচ্চ ৩শ’ টাকা। ছয় সদস্যের পরিবারে তাতে কোনোমতে দু’বেলা খাবার জোটে। অভাবের তাড়নায় তার মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কলেজ পড়ুয়া বড় ছেলেকেও টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন।

‘গরু বিক্রি করে আর নৌকার মাঝি হয়ে বেঁচে থাকব, কোনোদিন ভাবতেও পারিনি,’ বলছিলেন নূর।

“প্রতিদিন টিকে থাকতেই লড়াই করতে হচ্ছে। দেনাও আছে দুই লাখ। কেমন করে শোধ করব, জানি না। ঋণ শোধ না করে নতুন চিংড়ি ঘের তৈরিও সম্ভব নয়। কয়েক বছর ধরে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। আর এখন দিনেদিনে তার আরও পতন হচ্ছে।”

নূর সরকারের সহায়তা আশা করে বলেন; “প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা ঠেকাতে পারি না। মহামারি শেষে চিংড়ি চাষের সুদিন ফিরতে পারে। তবে সেজন্য সরকারি সহায়তা দরকার। চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠার জন্যেই তা দেওয়া উচিৎ। সরকারকে অবশ্যই আমাদের কথা ভাবতে হবে।”

  • সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মতামত লিখুন :

প্রভাতী নিউজ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।