মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি পরিত্যক্ত মর্টারশেল উদ্ধার

রাশেদুল হক রাশেদ, চৌগাছা (যশোর): যশোরের চৌগাছায় মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি পরিত্যক্ত মর্টারশেল উদ্ধারকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই বিস্ফোরকটি বুধবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে পৌর শহরের কপোতাক্ষ ব্রিজঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে চৌগাছা থানা পুলিশ। ঘটনাটি স্থানীয়দের মাঝে যেমন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, তেমনি উদ্বেগও বাড়িয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি ব্রিজের নিচে গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তাদের চোখে পড়ে মাটির ভেতরে আংশিকভাবে দৃশ্যমান একটি লোহার বস্তু। প্রথমে তারা বিষয়টিকে সাধারণ কোনো পরিত্যক্ত লোহার টুকরো বলে মনে করলেও কাছে গিয়ে সন্দেহ হয়। পরে কৌতূহলবশত তারা মাটি খুঁড়ে বস্তুটি বের করেন। বস্তুটির আকার-আকৃতি দেখে তারা এটি মর্টারশেল হতে পারে বলে ধারণা করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে চৌগাছা থানায় খবর দেন।

খবর পেয়ে চৌগাছা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পুলিশ মর্টারশেলটি উদ্ধার করে সতর্কতার সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে, যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মাঝে এ সময় কিছুটা আতঙ্ক দেখা গেলেও পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কান্ত সরকার বলেন, “আমি প্রতিদিনের মতো ব্রিজঘাট এলাকার পারবাজারে বসে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করছিলাম। দুপুরের দিকে আমরা কয়েকজন একসঙ্গে বসে কথা বলছিলাম। হঠাৎ মাটির ভেতর থেকে লোহার একটি বস্তু চোখে পড়ে। আমরা সেটি সাবধানে বের করি। পরে বুঝতে পারি এটি বিপজ্জনক কিছু হতে পারে, তখনই পুলিশকে খবর দিই। পুলিশ এসে সেটি নিয়ে যায়।”

এ বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার রুহুল আমিন বলেন, “উদ্ধার হওয়া মর্টারশেলটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শত্রুদের ব্যবহার করা একটি শক্তিশালী মর্টারশেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন মাটির নিচে পড়ে থাকায় এতে জং ধরে গেছে এবং অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তবে এটি ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন।”

চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আমিন শিকদার জানান, “সংবাদ পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মর্টারশেলটি উদ্ধার করেছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের। দীর্ঘদিন মাটির নিচে থাকার কারণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

স্থানীয়দের মতে, কপোতাক্ষ নদী ও এর আশপাশের এলাকাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন সংঘর্ষের সাক্ষী ছিল। ফলে এ ধরনের বিস্ফোরক বা যুদ্ধের সরঞ্জাম মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে এত বছর পর এ ধরনের বস্তু উদ্ধার হওয়ায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিত্যক্ত বিস্ফোরক বস্তু অনেক সময় বাহ্যিকভাবে নষ্ট মনে হলেও ভেতরে সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে, যা যে কোনো সময় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই এ ধরনের কিছু পাওয়া গেলে সাধারণ মানুষের তা স্পর্শ না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা উচিত।

এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নতুন করে ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু থেকে নিরাপদ থাকতে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই

প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!