রাশেদুল হক রাশেদ ,চৌগাছা যশোর: যশোরের চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা ইউনিয়নের জামিরা গ্রামে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা ঘটেছে। বহু এনজিওর ঋণ ও কিস্তির চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে কাজল ঘোস নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকালে গ্রামের মন্দির সংলগ্ন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে ২০২৬ তারিখ বেলা ১২টার পর থেকে কাজল ঘোস নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরে পরিবারের লোকজন চৌগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তাদের আরও একদিন অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয় বলে পরিবারের দাবি।
এরপর শুক্রবার জামিরা গ্রামের মন্দিরের পাশের একটি স্থানে মাছুম নামে এক ব্যক্তি তাল কাটার উদ্দেশ্যে গাছে ওঠেন। এসময় নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি একটি মরদেহ দেখতে পান। বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে খবর পেয়ে চৌগাছা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।
পরে মরদেহটি কাজল ঘোসের বলে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। তিনি মৃত কালিদাস ঘোসের ছেলে এবং উষা ঘোসের সন্তান। ঘটনাস্থল থেকে একটি কীটনাশকের বোতলও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কীটনাশক পান করেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, কাজল ঘোস দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছিলেন। সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি ও নানা চাপ সামলাতে গিয়ে তিনি একের পর এক এনজিও থেকে ঋণ নিতে থাকেন। প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তির চাপ ধীরে ধীরে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। প্রতিদিন কিস্তির জন্য চাপ, ফোনকল ও বাড়িতে লোকজনের আসা-যাওয়া তাকে আরও হতাশাগ্রস্ত করে তোলে বলে দাবি পরিবারের।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, কাজল ঘোস খুবই শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সংসার চালাতে হিমশিম খেলেও কখনো কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাকে খুব চিন্তিত ও অস্থির দেখা যেত। অনেক সময় তিনি চুপচাপ থাকতেন এবং মানুষের সঙ্গে কম কথা বলতেন।
নিহত কাজল ঘোসের পরিবারে রয়েছে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে কোয়েল নাগ (১৭) এবং ছোট মেয়ে কথা ঘোস (১৩)। বাবার মৃত্যুতে দুই কিশোরীর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবার ও স্বজনরা।
গ্রামের অনেকেই বলছেন, গ্রামীণ সমাজে এনজিও ঋণ এখন আশীর্বাদের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণ পেলেও নিয়মিত কিস্তির চাপ সামলাতে না পেরে অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ কেউ আবার চরম হতাশায় আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। তারা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
চৌগাছা থানার পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!