ওয়াসিম ফারুক: রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড আবারও রক্তাক্ত। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া দেশের একসময়কার শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে রাজধানীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটার দিকে নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন বটতলা এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর এলাকা তখনও মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত। দোকানপাট খোলা, রাস্তায় যানবাহনের চাপ, চারদিকে স্বাভাবিক কোলাহল। ঠিক সেই সময় দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন টিটন। হঠাৎ মোটরসাইকেলে এসে থামে দুই যুবক। দুজনের মুখেই মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ ছিল। কোনো ধরনের কথা না বলেই তারা খুব কাছ থেকে টিটনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
প্রথমে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে টিটন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীদের একজন দৌড়ে কাছে গিয়ে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে ঘাতক মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে নিশ্চিত হয় যে টিটন আর বেঁচে নেই। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র এক মিনিটের মধ্যে। স্থানীয়রা ধাওয়া দিলে পালানোর সময় হামলাকারীরা ফাঁকা গুলিও ছোড়ে। পরে মোটরসাইকেলে চড়ে তারা বিজিবি গেটের দিক দিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
রক্তাক্ত অবস্থায় পথচারীরা টিটনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত ৮টা ২৭ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তার মাথা, হাত, বগল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা দেখে স্থানীয়দের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পুলিশ শুরু থেকেই এটিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্তঃকোন্দলের ফলাফল হিসেবে দেখছে। তবে হত্যার নেপথ্যে কে বা কারা, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ড মূলত পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ। বিশেষ করে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই টিটনকে হত্যা করা হয়েছে বলে আলোচনা চলছে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য একটি অংশ সন্দেহ করছে, টিটনের ভগ্নিপতি ও একসময়কার ঘনিষ্ঠ সহযোগী শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের সঙ্গে বিরোধই শেষ পর্যন্ত এই হত্যার দিকে নিয়ে গেছে।
অপরাধ জগতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনের উত্থান ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় তখন দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অস্ত্রভিত্তিক সন্ত্রাস। সেই সময় স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন টিটন। তার সংগঠনের মূল শক্তি ছিল ভয় সৃষ্টি এবং অত্যন্ত দ্রুত ও নির্মম হামলা পরিচালনা। পরবর্তীতে তার ভাই মামুন, টুটুল এবং কিলার রসুকে নিয়ে গড়ে ওঠে একটি পারিবারিক অপরাধী নেটওয়ার্ক। এই বলয়ে যুক্ত হন সানজিদুল ইসলাম ইমন, যিনি পরবর্তীতে ‘ক্যাপ্টেন ইমন’ নামে পরিচিতি পান। ১৯৯৬ সালে ইমন টিটনের বোন শাহনাজ পারভীন লিনাকে বিয়ে করলে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। সেই সময় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই পরিবারভিত্তিক জোটকে অন্যতম ভয়ঙ্কর শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে টিটনের নাম ছিল দুই নম্বরে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, দখল এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ ছিল। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলাসহ একাধিক আলোচিত ঘটনায় তার নাম উঠে আসে। ২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে দীর্ঘ সময় বন্দি ছিলেন তিনি। প্রায় দুই দশক কারাগারে কাটানোর পর ২০২৪ সালের আগস্টে জামিনে মুক্তি পান টিটন। কিন্তু কারামুক্তির পর থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা।
অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র বলছে, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর টিটন দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্দি থাকায় তার জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল না। এনআইডি না থাকায় পাসপোর্ট করতে পারেননি। ফলে বৈধভাবে বিদেশে পালানোর সুযোগ হারান। পরে তিনি নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আত্মগোপনে থাকতে শুরু করেন। খুব সীমিত পরিসরে চলাফেরা করতেন এবং নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করতেন। এই সময় থেকেই তার ওপর নজরদারি শুরু হয় বলে ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। আন্ডারওয়ার্ল্ড সূত্রগুলো বলছে, দুবাইয়ে অবস্থানরত
সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই তালিকাভুক্ত শীর্ষসন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ সেখান থেকেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। ১৯৯৯ সালে রাজধানীর নিকুঞ্জে জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ছিলেন টিটনের । সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাসখানেক আগে দুবাই থেকে দেশে পাঠানো হয় মোহাম্মদপুরের কুখ্যাত ‘কিলার বাদল’কে। বাদল দীর্ঘদিন ধরে জোসেফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, দেশে ফিরে বাদল স্থানীয় সন্ত্রাসী সোর্স ব্যবহার করে টিটনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। কোথায় ওঠাবসা, কার সঙ্গে যোগাযোগ, কখন বের হন সব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে আরেকটি সু্ত্র মতে টিটন হত্যার তীর টিটনের ভগ্নিপতি ক্যাপ্টেন ইমনের দিকে। একসময় যাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী জোটের প্রতীক, সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শত্রুতায় রূপ নেয়। এর পেছনে বড় কারণ ছিল টিটনের ভাই টুটুলের মৃত্যু। আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, টুটুলকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার পেছনে ইমনের ভূমিকা ছিল। এরপর থেকেই টিটন ও ইমনের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট ও ধানমন্ডির আধিপত্য কে ধরে রাখবে তা নিয়ে শুরু হয় নীরব সংঘাত। টিটনের পক্ষ নেয় আরেক শীর্ষসন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল। ইমন মনে করতেন, টিটন বেঁচে থাকলে তার একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে টিটনও পিচ্চি হেলালের সহযোগিতায় পুরনো প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, টিটন হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারে ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তপন সানি। আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘হেজাজ’ নামে পরিচিত ইজাজ নিহত হওয়ার পর সানিই বর্তমানে ইমনের গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের ধরন ছিল অত্যন্ত পেশাদার। হামলাকারীরা মাত্র এক মিনিটে অপারেশন শেষ করে। লক্ষ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালানো হয়। পালানোর রুটও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। ফলে হামলাকারীরা সচেতনভাবেই এমন জায়গা নির্বাচন করেছে বলে ধারণা পুলিশের। রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। নিউমার্কেট থানার কর্মকর্তারাও বলছেন, হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। কারণ টিটন শুধু একজন সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন না তিনি বহু পুরনো অপরাধী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র ব্যবসা এবং চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার মৃত্যুতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, যা নিয়ে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে গত বছরের নভেম্বরে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে। সেই হত্যার তদন্তেও উঠে আসে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়। এখন টিটন হত্যার পর প্রশ্ন উঠেছে ঢাকার পুরনো আন্ডারওয়ার্ল্ড কি আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা বা বিদেশে পালিয়ে থাকা পুরনো সন্ত্রাসীরা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অপরাধী চক্রও পুরনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সংঘাতের ধরন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
টিটন হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানীর অপরাধ জগতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো এটি কি শুধুই প্রতিশোধ, নাকি ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠনের সূচনা? কারণ যেভাবে পরিকল্পিতভাবে প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়; বরং একটি বার্তা দেওয়ার কৌশল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো অনেক নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তারা সময় ও পরিস্থিতি বুঝে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত কিছু পলাতক সন্ত্রাসী এখনো দেশীয় অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। নিউমার্কেটের ব্যস্ত সড়কে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয় এটি রাজধানীর অপরাধ জগতের গভীরে চলমান অদৃশ্য যুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিশোধ, আধিপত্য, পারিবারিক বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুরনো রক্তঋণের জটিল সমীকরণ মিলিয়ে টিটনের মৃত্যু ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলেই মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!