নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা অনুদান পাওয়া নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সংগঠনের সাবেক নেতাদের এক পক্ষ এই অর্থের তথ্য গোপন ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুললেও অন্য পক্ষ বলছে, যাবতীয় নিয়ম মেনেই অনুদান গ্রহণ এবং অডিট সম্পন্ন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিলুপ্ত কমিটির মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা এই আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর অভিযোগের মূল পয়েন্টগুলো হলো:
• তথ্য গোপন: প্রচারের সময় বলা হয়েছিল কর্মসূচিটি ব্যক্তিগত খরচে হবে, কিন্তু গোপনে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ১ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
• স্বচ্ছতার অভাব: ১২ এপ্রিলের এক সভায় সংগঠনের শীর্ষ নেতারা 'একটি ফাউন্ডেশনের' মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের কথা স্বীকার করলেও ব্যয়ের কোনো সঠিক হিসাব দেননি।
• অভিযুক্ত নেতা: সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম এই তথ্য গোপন করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
অভিযোগের পরদিন ফেসবুক লাইভে এসে এর ব্যাখ্যা দেন সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ (যিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির অঙ্গসংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক)। তাঁর ভাষ্যমতে:
• তদন্তে সহায়তার আশ্বাস: তিনি যেকোনো তদন্তকারী সংস্থাকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে নিজেই নথিপত্র নিয়ে হাজির হবেন বলে জানান।
• তহবিলের উৎস: নির্বাচনের আগে 'ইয়েস ক্যাম্পেইন' পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সিএসআর (CSR) ফান্ড থেকে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এই যোগাযোগ হয়।
• আইনি প্রক্রিয়া ও ফাউন্ডেশন: যেহেতু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো নিবন্ধিত সংগঠন নয়, তাই আইনি জটিলতা এড়াতে ‘স্যাড’ (SAD) নামক একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই অর্থ গ্রহণ করা হয়।
রিফাত রশিদ জানান, শুরুতে ১২ কোটি টাকার একটি পরিকল্পনা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৫ কোটি টাকার চুক্তি হয়। এর মধ্যে নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ কোটি টাকা প্রদান করে। এই টাকা যেসব খাতে ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে:
1. জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যারাভান ও প্রচার কার্যক্রম।
2. দেশজুড়ে 'ইয়েস গেট' নির্মাণ ও লিফলেট বিতরণ।
3. নির্বাচনের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রে এজেন্ট নিয়োগের চেষ্টা।
4. অনলাইন ও ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন।
রিফাত রশিদ দাবি করেন, এই ১ কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করানো হয়েছে। অডিট রিপোর্ট ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকের প্রতিনিধিরা এতে কোনো অসংগতি পাননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, এই বিতর্কের কয়েকদিন আগেই রিফাত রশিদ ও হাসিব আল ইসলামসহ একটি বড় অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়েছেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করেছেন, যা সংগঠনের ভেতরে বিভক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে ।
১ কোটি টাকার অনুদান নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভেতরে এখন প্রকাশ্য দ্বিধাবিভক্তি বিরাজ করছে। একদিকে স্বচ্ছতার দাবি, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়ায় অডিট সম্পন্ন করার পাল্টা যুক্তি—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!